জাতীয়

করোনায় নারীর জীবন ও জীবিকা

মোঃ হাবিবুর রহমান


অদৃশ্য করোনাভাইরাসে কাঁপছে দৃশ্যমান বিশ্ব। বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশও লকডাউনের কঠোরতা শিথিল করে স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফেরার চেস্টা করছে। প্রাণঘাতি এ ভাইরাসে একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে জীবন তেমনি অপরদিকে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বেঁচে থাকার অবলম্বন।

জনসচেতনতা বাড়ানো, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, সরকারি পদক্ষেপ, চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি ও প্রতিষেধক আবিষ্কারের ফলে কত দ্রুত এই সংকট থেকে উত্তরণ পাওয়া যায় সেই অপেক্ষায় সমগ্র মানব জাতি প্রহর গুনছে। করোনার এই সংকট কালেও নেতৃত্বে, সাহসিকতায়, সেবায়, দায়িত্বপালনে, মানবিকতায়, সকল ক্ষেত্রেই নারীর বিচরণ আমাদেরকে জাতি হিসেবে গর্বিত করেছে। পরিবারের ভিতরে ও বাইরে কর্মদক্ষতা, তৎপরতা আর মমতার বাঁধনে আগলে রেখে সুস্থ জীবন যাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে নারীরা ।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় ও বিদ্যমান স্বাস্থ্য সেবার গতি বৃদ্ধিতে জরুরী ভিত্তিতে ৬ হাজার সিনিয়র স্টাফ নার্সের পদ মঞ্জুরি করা হয়েছে এবং ৫০৫৪ জনকে নিয়োগ করা হয়েছে। যারা ইতোমধ্যে বীরদর্পে এ যুদ্ধে সামিল হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণী, পেশা ও অবস্থানে থেকে দৃঢ়তার সাথে নারীরা এই ভাইরাস মোকাবেলায় যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। মানব সভ্যতার এ সংকটকালে নেতৃত্বের কান্ডারী হিসেবে রয়েছেন উন্নয়নের অভিযাত্রী ও মানবতার জননী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে প্রায় অর্ধ লক্ষ মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত তম্মধ্যে পুরুষ ৭৫% এবং নারী ২৫%। এছাড়া মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৬৭২ জন যার মধ্যে ৬৮% পুরুষ এবং ৩২ % মহিলা রয়েছে। এদিকে জীবন ও কর্মসংস্থান সচল রাখতে করোনা ঝুঁকির মধ্যেও ৩১ মে, ২০২০ থেকে বিধিনিষেধ মেনে সীমিত পরিসরে সকল অফিস, গণপরিবহণ, দোকান-পাট, ব্যবসা-বাণিজ্য চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখাসহ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নানা দায়িত্বপালনে নিরলসভাবে দিন-রাত কাজ করছেন নারীরা। দুগ্ধপোষ্য শিশুকে বাসায় রেখে বা গর্ভবতী হয়েও দায়িত্বপালনে এক ধাপ পিছ পা হয় নাই তারা। ইতোমধ্যে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে দায়িত্বপালন করতে গিয়েও বেশ কয়েকজন নারী কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন। আবার অনেকেই দক্ষ হাতে আক্রান্তদের সামাজিকভাবে হেয়কারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং আক্রান্তদের পাশে থেকে সাহস যুগিয়েছেন, খাদ্য সরবরাহ করেছেন এবং নানাবিধ সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন । তাই তো “নারী মহীয়সী” উপমা এসেছে তার রূপের বৈশিষ্ট্যে নয়, বরং তার কর্মদক্ষতা ও মানবিক গুণাবলীর কারণে। করোনার এই সংকটকালে মহীয়সী নারীদের উজ্জল দৃষ্টান্ত বার বার ফুটে উঠেছে আমাদের সামনে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে ২০২০ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮.২ শতাংশ থেকে নেমে ২ বা ৩ শতাংশে দাঁড়াবে। তৈরীপোশাক শিল্পের রপ্তানী হ্রাস, রেমিটেন্স প্রবাহের নিম্নগতি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ায় সেবাখাতের অবদান নিম্নমুখী হওয়ায় জাতীয় অর্থনীতিতে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হ্রাস পেতে পারে। বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, করোনার প্রভাবে গত দুই মাসে তিনশ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে। এছাড়া বিশ্বব্যাংক বৈশ্বিক ক্ষতির প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ ২২ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যাওয়ার আশংকা করছে । তবে আন্তর্জাতিক মূদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর এপ্রিল ২০২০ মাসে প্রকাশিত রিপোর্টে বৈশ্বিক মহামারীর এ সময়েও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২০২০ সালে প্রবৃদ্ধির হার ২% ধরা হয়েছে এবং ২০২১ সালে দ্রুতই অর্থনীতি ঘুরে দাড়িয়ে এ হার ৯.৫ শতাংশে রেকর্ড স্পর্শ করবে মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবিএস এর তথ্য মতে ২০১৯ সালে বাংলাদেশের দারিদ্র্য হার ২০.৫ শতাংশ এবং হত দারিদ্র্য হার ১০.৫ শতাংশ ছিল। করোনার প্রভাবে দেশে এ হার বেড়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে মর্মে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ।

অর্থনৈতিক মন্দার সম্ভাব্য ধাক্কা নারীর জীবন ও জীবিকায় ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। করোনার ছোবলে অনেকেই জীবন বিসর্জন দিয়েছেন আবার অনেকেই কর্ম হারিয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা বাসায় দীর্ঘক্ষণ থাকায় বেশি বেশি রান্নার কাজে সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। এছাড়া আগের চেয়ে গৃহকর্ত্রীর দায়িত্ব বহুলাংশে বেড়েছে। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা সহযোগিতা করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা নগন্য। ডে-কেয়ার সেন্টার না খোলায় কর্মজীবি মায়েরা পড়েছেন ভীষন বিপদে। খাদ্য ও অন্যান্য সহযোগিতা না পেয়ে যৌনকর্মীরা কস্টে আছে, লকদাঊনের এই সময়ে তাদের আয়-রোজগার বন্ধ হওয়ায় নানবিধ সমস্যায় দিনযাপন করছে। করোনার দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাবে তাদের এ পেশাই হয়ত বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তাদেরকে বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ বেছে নিতে হবে। এছাড়া কর্মহীন পয়ে পড়েছে গৃহপরিচারিকা, শ্রমজীবি, গার্মেন্টস কর্মী, বিউটিশিয়ান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, খেলোয়ারসহ নানা পেশায় নিয়োজিত নারী সমাজ। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কার্যক্রম নারীদের জীবন ও জীবিকায় সহায়ক হলেও তা আরো সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এছাড়া নারীর কর্মসংস্থানের উপর ব্যাপকভাবে জোর দিতে হবে। কর্মজীবি মায়েদের কর্মক্ষেত্র-পরিবারের কাজের ভারসাম্য রক্ষার্থে স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণ করে ডে-কেয়ার সেন্টারগুলো দ্রুতই চালু করা প্রয়োজন। করোনা কালে অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যাবহার করে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় বা ই-কমার্সের ক্ষেত্রে অনেক নারীই সফল উদ্যোক্তার পরিচয় দিয়েছে যা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়েছে।

সংসারে নারীর ত্যাগ খাতায় যোগফল টেনে হিসাব কষা যায় না। সকালে সর্বপ্রথম ঘুম থেকে উঠে আর সবার শেষে ঘুমাতে যায় নারী। দীর্ঘ লকডাউনকালে সাংসারিক কাজে বাড়তি চাপ সামাল দিতে জেন্ডার বৈষম্য কমিয়ে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের এগিয়ে আসা দরকার। লকডাউনে মানসিক চাপের কারনে মনোমালিন্য বাড়তে পারে এবং নারীর প্রতি সহিংস আচরণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এ সকল ক্ষেত্রে পারস্পারিক সৌহার্দ্য ও আলোচনার মাধ্যমে পারিবারিক সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। করোনার প্রভাবে লকডাউনে মহিলাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণের সম্ভাবনা রয়েছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকায় এ সময়ে গর্ভধারণে তাদের নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন।

জীবনযাত্রায় চলাফেরা সীমিত ও সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে জন্মনিরোধক ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সামগ্রীর সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীকে আরো সতর্ক ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

কোভিড এবং নন-কোভিড রোগীদের এ সময় হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে তাই নারী, বয়স্ক ও শিশুদের প্রতি অধিক যত্নবান হতে হবে। প্রয়োজনে টেলিমেডিসিন এর মাধ্যমে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যকর খাবার ও পুস্টিগুণসম্মৃদ্ধ ফলমূল বেশি খেতে হবে যাতে শরীরের ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। উদ্বেগের সাথে মানুষ দীর্ঘদিন ঘরে থাকার ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে, এতে প্রথম সারিতেই স্বীকার হয়েছেন নারী ও শিশুরা। এ বিষয়গুলো সচেতনতার সাথে মোকাবেলা করতে হবে। দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকা, দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়াসহ করোনা সম্পর্কিত নানা কারণে বাল্য বিয়ে ও ঝরে পড়ার আশংকা বিদ্যমান । আমাদেরকে এসব সামাজিক সমস্যা উত্তরণে একাত্ম হয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। যদিও ইভ-টিজিংসহ অন্যান্য সামাজিক অপরাধের মাত্রা কমেছে, এ হার যাতে বৃদ্ধি না পায় সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।

নারীদের জীবনমানের উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতাসহ চলমান বিভিন্ন কর্মসুচী ও উন্নয়ন প্রকল্পের আকার ও পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে। অসহায় ও দুঃস্থ উপকারভোগীদের মাঝে ভাতা বিতরণ বাড়াতে হবে। ইতোমধ্যে সরকার চলমান অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে এ পর্যন্ত মোট ১১ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারের ১৮টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যা দেশের মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এভাবে সামাজিক সুরক্ষা খাতসহ বিবিধ প্রণোদনা প্যকেজ ঘোষণা করে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে।

চাকুরীহীনতার কারণে অনেকের আয় না থাকায় এবং চলমান পারিবারিক ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে অস্থিরতা বৃদ্ধির আশংকা রয়েছে। অনেক ঋণ গ্রহীতারাই ঋণ খেলাপীর বেড়াজালে আবদ্ধ হবে। তাই নারীদের কর্মসংস্থানের পথ সুগম করতে দক্ষতাবৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা জরুরী। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য মতে, বেকারত্বের ধারাবাহিকতায় পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। চলমান মহামারিতে নারীদের কর্মহীনতা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি হচ্ছে ফলে চাকরির বাজারে তাদের প্রতিযোগিতা ও বৈষম্য বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেস্টনীর উপকারভোগীদের সুদমুক্ত ঋণ প্রদান এবং নারীদের দক্ষতাবৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান শেষে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এছাড়া কোভিড-১৯ মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধির বিভিন্ন নির্দেশনা যথাযথ অনুসরণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নারীদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার প্রয়োজন রয়েছে।

নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা তৈরীতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বিশেষ কর্মসূচী বা প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক মহিলাদের জন্য কৃষি, পোল্ট্রি ও মৎস্য খাতে ঋণ সুবিধাসহবিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারে । কেননা নারীর দক্ষতাই বয়ে আনতে পারে দেশের কল্যাণ ও সম্মৃদ্ধি।

                                           লেখকঃ  মোঃ হাবিবুর রহমান
উপসচিব

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়
                                     Email: habib.mopa@gmail.com

Related Articles

Back to top button
Close