সুরা আল-ক্বদর – বিস্ময়কর তাফসীর

rafel shahabrafel shahab
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  11:59 PM, 20 May 2020

রাজিব হাসান,
ইসলামি বই লেখক, ফেসবুক এক্টিভিস্ট :

ইমাম আবূ মুহাম্মদ ইবনে আবী হাতিম (রহ:) এই সূরার তাফসীর প্রসঙ্গে একটি বিস্ময়কর রিওয়াইয়াত আনয়ন করেছেন। সাহাবা হযরত কা’ব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন যে, সপ্তম আকাশের শেষ সীমায় জান্নাতের সাথে সংযুক্ত রয়েছে সিদরাতুল মুনতাহা, যা দুনিয়া ও আখিরাতের দূরত্বের উপর অবস্থিত। এর উচ্চতা জান্নাতে এবং এর শিকড় ও শাখা প্রশাখাগুলো আল্লাহর কুরসীর নিচে প্রসারিত। তাতে এতো ফেরেশতা অবস্থান করেন যে, তাদের সংখ্যা নির্ণয় করা আল্লাহ পাক ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এমনকি চুল পরিমাণও জায়গা নেই যেখানে ফেরেশতা নেই। ঐ বৃক্ষের মধ্যভাগে হযরত জিব্রীল (‘য়ালাইহি সালাম) অবস্থান করেন।

.
আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে হযরত জিব্রীল (আ:) কে ডাক দিয়ে বলা হয়, “হে জিব্রীল! ক্বদরের রাত্রিতে সমস্ত ফেরেশতাকে নিয়ে পৃথিবীতে চলে যাও”।
এই ফেরেশতাদের সবারই অন্তর স্নেহ ও দয়ায় ভরপুর। প্রত্যেক মু’মিনের জন্যে তাঁদের মনে অনুগ্রহের প্রেরণা রয়েছে। সূর্যাস্তের সাথে সাথেই ক্বদরের রাত্রিতে এসব ফেরেশতা হযরত জিব্রীল (আ:)-এর সাথে নেমে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েন এবং সব জায়গায় সিজদায় পড়ে যান। তাঁরা সকল ঈমানদার নারী পুরুষের জন্য দুয়া করেন। কিন্তু তাঁরা #গীর্জায় #মন্দিরে#অগ্নিপূজার জায়গায়, #মূর্তিপূজার জায়গায়, #আবর্জনা ফেলার জায়গায়, #নেশাখোরের অবস্থান স্থলে, #নেশাজাত দ্রব্যাদি রাখার জায়গায়, #মূর্তি রাখার জায়গায়, #গান বাজনার সাজ সরঞ্জাম রাখার জায়গায় এবং #প্রস্রাব পায়খানার জায়গায় গমন করেন না।

.
এছাড়া বাকি সব জায়গায় ঘুরে ঘুরে তাঁরা ঈমানদার নারী পুরুষের জন্যে দুয়া করে থাকেন। হযরত জিব্রীল(আ:) সকল ঈমানদারের সাথে করমর্দন (মুসাফা) করেন। তাঁর করমর্দনের সময় মু’মিন ব্যক্তির শরীরের লোমকূপ খাড়া হয়ে যায়, মন নরম হয় এবং অশ্রুধারা নেমে আসে। এসব নিদর্শন দেখা দিলে বুঝতে হবে তার হাত হযরত জিব্রীল(আ:) এর হাতের মধ্যে রয়েছে। [সুবহানাল্লাহ ]

.
হযরত কা’ব (রা:) বলেন যে, ঐ রাত্রে যে ব্যক্তি তিনবার লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করে, তার প্রথমবারের পাঠের সাথে সাথেই সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়।দ্বিতীয়বার পড়ার সাথে সাথেই আগুন থেকে মুক্তি পেয়ে যায় এবং তৃতীয়বারের পাঠের সাথে সাথেই জান্নাতে প্রবেশ সুনিশ্চিত হয়ে যায়। বর্ণনাকারী বলেন, হে আবু ইসহাক(রহ:), যে ব্যক্তি সত্য বিশ্বাসের সাথে এ কালেমা উচ্চারণ করে তার কি হয়? জবাবে তিনি বলেন, সত্য বিশ্বাসীর মুখ হতেই তো এ কালেমা উচ্চারিত হবে। যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ ! লাইলাতুল ক্বদর কাফির ও মুনাফিক্বদের উপর এতো ভারী বোধ হয় যে, যেন তাদের পিঠে পাহাড় পতিত হয়েছে। ফজর পর্যন্ত ফেরেশতারা এভাবে রাত্রি কাটিয়ে দেন।
.

তারপর হযরত জিব্রীল (আ:) উপরের দিকে উঠে যান এবং অনেক উপরে উঠে স্বীয় পালক/ডানা ছড়িয়ে দেন। অতঃপর তিনি তার বিশেষ দুটি সবুজ পালক প্রসারিত করেন যা অন্য কোন সময় প্রসারিত করেন না। এর ফলে সূর্যের কিরণ মলিন ও স্তিমিত হয়ে যায়। তারপর তিনি সমস্ত ফেরেশতাকে ডাক দিয়ে নিয়ে যান। সব ফেরেশতা উপরে উঠে গেলে তাদের নূর এবং হযরত জিব্রীল (আ:) এর পালকের নূর মিলিত হয়ে সূর্যের কিরণকে নিষ্প্রভ করে দেয়। ঐ দিন সূর্য অবাক হয়ে যায়। সমস্ত ফেরেশতা সেদিন আকাশ ও জমীনের মধ্যবর্তী স্থানের ঈমানদার নারী পুরুষের জন্য রহমত কামনা করে তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। তাঁরা ঐ সকল লোকের জন্যেও দুয়া করেন যারা সৎ নিয়তে রোযা রাখে এবং সুযোগ পেলে পরবর্তী রমযান মাসেও আল্লাহর ইবাদত করার মনোভাব পোষণ করে।

.
সন্ধ্যায় সবাই প্রথম আসমানে পৌঁছে যান। সেখানে অবস্থানকারী ফেরেশতারা এসে তখন পৃথিবীতে অবস্থানকারী ঈমানদারদের অমুকের পুত্র অমুক, অমুকের কন্যা অমুক, বলে বলে খবরাখবর জিজ্ঞেস করেন। নির্দিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার পর কোন কোন ব্যক্তি সম্পর্কে ফেরেশতারা বলেন, তাকে আমরা গত বছর ইবাদতে লিপ্ত দেখেছিলাম, কিন্তু এবার সে বিদআতে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। আবার অমুককে গত বছর বিদ’আতে লিপ্ত দেখেছিলাম, কিন্তু এবার তাকে ইবাদতে লিপ্ত দেখে এসেছি।প্রশ্নকারী ফেরেশতা তখন শেষোক্ত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে মাগফিরাত, রহমতের দুয়া করেন।

.
ফেরেশতারা প্রশ্নকারী ফেরেশতাদেরকে আরো জানান যে, তাঁরা অমুক অমুককে আল্লাহর যিকর করতে দেখেছেন, অমুক অমুককে রুকূতে, অমুক অমুককে সিজদায় পেয়েছেন এবং অমুক অমুককে কুরআন তিলোওয়াত করতে দেখেছেন। একরাত একদিন প্রথম আসমানে কাটিয়ে তাঁরা দ্বিতীয় আসমানে গমন করেন। সেখানেও একই অবস্থার সৃষ্টি হয়। এমনি করে তাঁরা নিজেদের জায়গা সিদরাতুল মুনতাহায় গিয়ে পৌঁছেন। সিদরাতুল মুনতাহা তাঁদেরকে বলে, আমাতে অবস্থানকারী হিসেবে তোমাদের প্রতি আমাদের দাবী রয়েছে। আল্লাহকে যারা ভালোবাসে আমিও তাদেরকে ভালবাসি। আমাকে তাদের অবস্থার কথা একটু শোনাও, তাদের নাম শোনাও।


হযরত কা’ব (রা:) বলেন, ফেরেশতারা তখন আল্লাহর পূণ্যবান বান্দাদের নাম ও পিতার নাম জানাতে শুরু করেন। এরপর জান্নাত সিদরাতুল মুনতাহাকে সম্বোধন করে বলে, তোমাতে অবস্থানকারীরা তোমাকে যে সব খবর শুনিয়েছে সেসব আমাকেও একটু শোনাও। তখন সিদরাতুল মুনতাহা জান্নাতকে সব কথা শুনিয়ে দেয়। শোনার পর জান্নাত বলে, অমুক পুরুষ ও নারীর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। হে আল্লাহ ! অতি শীঘ্রই তাদেরকে আমার সাথে মিলিত করুন।[সুবহানাল্লাহ]

.
হযরত জিব্রীল (আ:) সর্বপ্রথম নিজের জায়গায় পৌঁছে যান। তাঁর উপর তখন ইলহাম হয় এবং তিনি বলেন, হে আল্লাহ ! আমি আপনার অমুক অমুক বান্দাকে সিজদারত অবস্থায় দেখেছি। আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। আল্লাহ তায়ালা তখন বলেন, আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম। জিব্রীল (আ:) তখন আল্লাহর আরশ বহনকারী ফেরেশতাদরকে এ কথা শুনিয়ে দেন। তখন ফেরেশতারা পরস্পর বলাবলি করেন যে, অমুক অমুক নারী পুরুষের উপর আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত হয়েছে।

.
তারপর হযরত জিব্রীল (আ:) বলেন, হে আল্লাহ ! গত বছর আমি অমুক অমুক ব্যক্তিতে সুন্নাতের উপর আমলকারী এবং আপনার ইবাদতকারী হিসেবে দেখেছি কিন্তু এবার সে বিদ’আতে লিপ্ত হয়ে পড়েছে এবং আপনার বিধি বিধানের অবাধ্যতা করেছে। তখন আল্লাহ তাবারাক ওয়া তা’য়ালা বলেন, হে জিব্রীল ! সে যদি মৃত্যুর তিন মিনিট পূর্বেও তাওবা করে নেয় তাহলে আমি তাকে মাফ করে দেবো। জিব্রীল (আ:) হঠাৎ করে বলেন, হে আল্লাহ! আপনারই জন্যে সমস্ত প্রশংসা। আপনি সমস্ত প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। হে আমার প্রতিপালক ! আপনি আপনার সৃষ্ট জীবের উপর সবচেয়ে বড় মেহেরবান। বান্দা তার নিজের উপর যেরূপ মেহেরবানী করে থাকে আপনার মেহেরবানী তাদের প্রতি তার চেয়েও অধিক। ঐ সময় আরশ এবং তার চারপাশের পর্দাসমূহ এবং আকাশ ও তার মধ্যস্থিত সবকিছুই কেঁপে ওঠে বলে, “করুণাময় আল্লাহর জন্যেই সমস্ত প্রশংসা”।

.
হযরত কা’ব (রা:) বলেন, যে ব্যক্তি রমাদ্বানের রোযা পূর্ণ করে রমাদ্বানের পরেও পাপমুক্ত জীবন যাপনের মনোভাব পোষণ করে সে বিনা প্রশ্নে ও বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

[সূরাত্বুল ক্বদর, তাফসীরে ইবনে কাথ্বির]

.
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহ ‘য়ানহু) হতে বর্ণিত আছে যে, রামাদ্বান মাস এসে গেলে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘য়ালাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতেন; “(হে জনমণ্ডলী) তোমাদের উপর রামাদ্বান মাস এসে পড়েছে। এ মাস খুবই বরকতপূর্ণ বা কল্যাণময়। আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের উপর এ মাসের রোযা ফরয করেছেন। এ মাসে জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। আর শয়তানদেরকে বন্দী করে রাখা হয়। এ মাসে এমন একটি রাত্রি রয়েছে যে রাত্রি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ মাসের কল্যাণ হতে যে ব্যক্তি বঞ্চিত হয় সে প্রকৃতই #হতভাগ্য।” [নাসাঈ-তেও এসেছে]

.
আবূ দাউদ তায়ালাসী (রহ:) বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “লাইলাতুল ক্বদর পরিষ্কার, স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ এবং শীত গরম হতে মুক্ত রাত্রি। এ রাত্রি শেষে সূর্য স্নিগ্ধ আলোক-আভায় রক্তিম বর্ণে উদিত হয়।”

.
হযরত জাবির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘য়ালাইহি ওয়া সাল্লাম) একবার বলেছিলেন; আমাকে লাইলাতুল ক্বদর দেখানো হয়েছে। তারপর ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। রামাদ্বান মাসের শেষ দশ রাত্রির মধ্যে এটা রয়েছে। এ রাত্রি খুবই শান্তিপূর্ণ, মর্যাদাপূর্ণ, স্বচ্ছ ও পরিষ্কার। এ রাত্রে শীতও বেশি থাকে না এবং গরমও বেশি থাকে না। এ রাত্রি এতো বেশি রওশন ও উজ্জ্বল থাকে যে, মনে হয় যেন চাঁদ হাসছে। রৌদ্রের তাপ ছড়িয়ে পড়ার আগে সূর্যের সাথে শয়তান আত্মপ্রকাশ করে না।”

আবু হুরাইরা (রাদি’য়াল্লাহু ‘য়ানহু) হতে আরো বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘য়ালাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের নিয়তে ক্বদরের রাত্রিতে ইবাদত করে, তার পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মার্জনা করে দেয়া হয়।” [বুখারী, মুসলিম]

আপনার মতামত লিখুন :