শাওয়ালের ছিয়ামঃ ফজিলত এবং মাসাইল

rafel shahabrafel shahab
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  11:28 AM, 12 June 2020

আরবি বারো মাসের মধ্যে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস “রমাযান”। আর রমাযানের পরবর্তী মাসের নাম “শাওয়াল” যা এখন চলছে। রমাযান মাসব্যাপী ছিয়াম সাধনা করা, প্রতিটি মুসলিম নর/নারীর জন্য ছিল ফরজ। যে ছিয়ামের গুরুত্ব, মাহাত্ম্য কিংবা ফজিলতের অন্ত নেই। পাশাপাশি রমাযান পরবর্তী শাওয়ালেরও নির্ধারিত কিছু নফল ছিয়াম আছে, যার গুরুত্ব কিংবা ফজিলতও কোনো অংশেই কম নয়। শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে ফরজ না হলেও, নফল সিয়ামের মধ্যে অন্যতম বলা যায়। আর এটি মনে রাখা ভালো যে, কাল কিয়ামতের ময়দানে ফরজ ইবাদত গুলোর পাশাপাশি নফল ইবাদত গুলো হবে অনেক ফলদায়ক। এমনকি অনেকেরই শুধুমাত্র ফরজ ইবাদত হিসাব করে জান্নাত যাওয়া সহজ হবে না, তখন ব্যক্তির নফল আমল তালাশ করা হবে। যদি পাওয়া যায়, তা দ্বারা ফরজকে পূর্ণ করা হবে, সুবহানাহু ওয়া বি হামদিহি। যনটি হাদিসে এসেছে-
إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ النَّاسُ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ أَعْمَالِهِمُ الصَّلَاةُ قَالَ يَقُولُ رَبُّنَا جَلَّ وَعَزَّ لِمَلَائِكَتِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ انْظُرُوا فِي صَلَاةِ عَبْدِي أَتَمَّهَا أَمْ نَقَصَهَا فَإِنْ كَانَتْ تَامَّةً كُتِبَتْ لَهُ تَامَّةً وَإِنْ كَانَ انْتَقَصَ مِنْهَا شَيْئًا قَالَ انْظُرُوا هَلْ لِعَبْدِي مِنْ تَطَوُّعٍ فَإِنْ كَانَ لَهُ تَطَوُّعٌ قَالَ أَتِمُّوا لِعَبْدِي فَرِيضَتَهُ مِنْ تَطَوُّعِهِ ثُمَّ تُؤْخَذُ الأَعْمَالُ عَلَى ذَاكُمْ ‏”‏.‏
রাসুল সঃ বলেনঃ আমাদের মহান রব্ব ফিরিশতাদের বান্দার সলাত সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও জিজ্ঞেস করবেন, দেখো তো সে তা পরিপূর্ণভাবে আদায় করেছে নাকি তাতে কোন ত্রুটি রয়েছে? অতঃপর বান্দার সলাত পূণার্ঙ্গ হলে পূণার্ঙ্গই লিখা হবে। আর যদি তাতে ত্রুটি থাকে তাহলে মহান আল্লাহ ফিরিশতাদের বলবেন, দেখো তো আমার বান্দার কোন নফল সলাত আছে কিনা? যদি থাকে তাহলে তিনি বলবেনঃ আমার বান্দার ফারয সলাতের ঘাটতি তার নফল সলাত দ্বারা পরিপূর্ণ করো। অতঃপর সকল আমলই এভাবে গ্রহণ করা হবে (অর্থাৎ নফল দ্বারা ফারযের ত্রুটি দূর করা হবে। [সহিহ আত-তিরমিযিঃ৮৬৪]

শাওয়ালের ৬টি ছিয়ামের মর্যদাঃ
রমাযান পরবর্তী শাওয়াল মাসে একজন মুসলিমের জন্য আরও ছয়টি নফল ছিয়াম আছে যার গুরুত্ব ও মর্যাদা অনেক। হাদিসের ভাষ্য মতে রমাযানের একেকটি ছিয়াম দ্বারা অন্য মাসের ১০ দিন ছিয়াম রাখার সমান। তাহলে ৩০*১০= ৩০০ (তিনশত) দিন। সেই সাথে শাওয়ালের ছয়টি ছিয়ামেও একেকটির বিনিময়ে আরও ১০ (৬*১০=৬০) দিন করে যোগ হবে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি রমাযানের ফরজ ছিযামের পাশাপাশি এই শাওয়াল মাসের ৬টি ছিয়াম পালন করে, তাহলে উক্ত ব্যক্তির আমল নামায় (৩০০+৬০) ৩৬০ দিন বা পূর্ন এক বছরের ছিয়াম পালন করার সোয়াব দেওয়া হবে, সুবহানাহ। যেমনটা হাদীছে এসেছে, عَنْ أَبِى أَيُّوبَ الأَنْصَارِىِّ رضى الله عنه أَنَّهُ حَدَّثَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّالٍ كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ.
আবু আইয়ূব (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রামাযানের (ফরয) ছিয়াম রাখার পরে শাওয়াল মাসের ছয়টি ছিয়াম পালন করে, সে ব্যক্তি পূর্ণ এক বছরের ছিয়াম পালন করার সমান নেকী লাভ করে’।[সহিহ মুসলিমঃ২৮১৫]

মাসাইলঃ
০১. কোনো ব্যক্তির যে কোনো কারনে, রমাযান মাসের কয়েকটি ছিয়াম কাজা হয়েছে, এখন তিনি আগে কাজা ছিয়াম রাখবেন নাকি শাওয়ালের ছিয়াম?

উত্তরঃ এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট কোনো দলিল রাসূল সাঃ থেকে পাওয়া না যাওয়ায় বিদ্বানগণ দুই ভাগ হয়েছেন। কেহ আগে কাজা আদায়ের পক্ষে, কেহ বিলম্বে। তাদের মতে বরং আগে শাওয়ালের ছয়টি রাখাই উত্তম।
আমি ব্যক্তিগত ভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে, কোনো মতকেই অগ্রাহ্য করতে পারিনাই। কেননা, দুই পক্ষেরই যুক্তি খুব শক্তিশালী এবং যুক্তিযুক্ত। আলোচনা লম্বা হবে ভেবে তা আর উল্লেখ করলাম না। আশাকরি আপনি যে কোনোটি পালন করার ইখতিয়ার রাখেন। তাতে ভুল হবে না। অর্থাৎ আপনি আগে শাওয়ালের সিয়াম গুলোই রেখে নিতে পারেন, পরে কাজা। অথবা আগে কাজা, পরে শাওয়ালের সময় থাকলে শাওয়ালের ছিয়াম রাখবেন, অন্যথায় নয়। ওল্লাহু আ’লাম।
[সহিহ মুসলি-১৯৮৪, সহিহ বুখারি-১৯৫০, QA.islaminfo]

০২. শাওয়ালের ছয়টি ছিয়াম কিংবা কাজা ছিয়াম কি লাগাতার রাখতে হবে, না কি ছেড়ে ছেড়ে রাখা যাবে?
উত্তরঃ না, লাগাতার রাখা শর্ত নয়। বরং ধীরে-ধীরে সুবিধামত রাখা যাবে।

০৩. নফল রোযার জন্য কি নয়ত শর্ত?
উত্তরঃ হ্যা অবশ্যই নিয়ত শর্ত। যে কোনো ইবাদতেরই নিয়ত করতে হয়। ফরজ ছিয়ামেরও। কিন্তু ফরজ ছিয়ামের নিয়ত যে কোনো সময় করা যায়, এমনকি দিনের বেলাতেও। কিন্তু নফল ছিয়ামের জন্য অবশ্যই রাতেই নিয়ত করতে হবে। তবে হ্যা, নিয়ত মানে মুখের উচ্চারন করা নয়, বরং মনের সংকল্প করাটাই নিয়ত।

০৪. কাজা কিংবা নফল ছিয়ামের জন্য তারাবিহ শর্ত কি?
উত্তরঃ না তারাবিহ শর্ত নয়।
০৫. এক নিয়তে কাজা, আইয়ামে বিজ ( প্রত্যেক আরবি মাসের ১৩/১৪/১৫ তারিখের ছিয়াম) এবং শাওয়ালের ছিয়াম হবে কী?
উত্তরঃ এ বেপারে সকল ওলামায়েকেরাম একমত যে, কাজা ছিয়ামের সাথে নফল ছিয়াম এক নিয়তে হবে না। তবে যাদের আইয়ামে বিজের ছিয়াম নিয়মিত করার অভ্যাস আছে, তারা এক নিয়তে দুইটা আমলের সোয়াব পাবেন আশা করা যায়। ওল্লাহু আ’লাম।

[লেখকঃ গোলাম রব্বাণী রোমান। চেয়ারম্যান, আন-নূর সাইন্টিফিক মাদরাসা]

আপনার মতামত লিখুন :